" /> মেসির আর্জেন্টিনার বিশ্ব জয় – নাগরিক দৃষ্টি টেলিভিশন
শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন

মেসির আর্জেন্টিনার বিশ্ব জয়

argentina world cup 696x392 1

10 / 100


বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর চিত্রনাট্যের সমাপ্তিটা হলো লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা উৎসবের মধ্য দিয়ে। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারানোর পর -এএফপি
ফুটবল বিধাতার হেঁয়ালি বোঝা সত্যিই দায়! কাতারে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা যার হাতে দেখতে উন্মুখ ছিল গোটা ফুটবলবিশ্ব, সেই লিওনেল মেসির গলাতেই শেষ পর্যন্ত উঠেছে বরমাল্য।

তবে স্নায়ু বিবশ করা যে চরম নাটকীয়তার পর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর চিত্রনাট্যের সমাপ্তিটা হয়েছে মেসির হাতে ট্রফি ওঠার মধ্য দিয়ে, তা হয়তো কারও দূরতম কল্পনাতেও ছিল না।

রোববার দোহার লুসাইল স্টেডিয়ামে তর্কসাপেক্ষে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ফাইনালে এমবাপ্পের ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে ৩৬ বছরের হাহাকার ঘুচিয়ে মেসির আর্জেন্টিনা জিতেছে নিজেদের তৃতীয় বিশ্বসেরার মুকুট।

এমবাপ্পের অনবদ্য হ্যাটট্রিকে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েও ইতালি ও ব্রাজিলের পর তৃতীয় দল হিসাবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়তে পারেনি ফ্রান্স। এ যেন নিয়তিরই লিখন ছিল।

মেসির জোড়া গোল, দি মারিয়ার একটি ও এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক মিলিয়ে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচে ছিল ৩-৩ সমতা। টাইব্রেকারে মেসিকে জিতিয়ে যেন ঋণমুক্ত হলো ফুটবল।

মেসির জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকা আর্জেন্টাইন গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজের হাত ধরেই শেষ পর্যন্ত ঘুচেছে বাঁ পায়ের জাদুকরের মহামহিম ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা।

টাইব্রেকারে কোমানের নেওয়া ফ্রান্সের দ্বিতীয় শট রুখে দিয়ে মার্তিনেজই গড়ে দেন ব্যবধান। তৃতীয় শট বাইরে মেরে ফ্রান্সকে বিষাদে ডোবান চুয়ামেনি। হ্যাটট্রিক হিরো এমবাপ্পে ও মুয়ানির লক্ষ্যভেদেও শেষরক্ষা হয়নি ফরাসিদের।

আর্জেন্টিনার হয়ে চার শটেই লক্ষ্যভেদ করেন মেসি, দিবালা, পারেদেস ও মন্তিয়েল। মন্তিয়েলের লক্ষ্যভেদে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হতেই লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে নীল-সাদা গর্জনের ঢেউ আছড়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে।

মেসি নামের রূপকথার শেষটা হলো স্বপ্নের মতোই। নিজের পঞ্চম ও শেষ বিশ্বকাপে অধরা শিরোপাটা জিতে সর্বকালের সেরা ফুটবলার নিয়ে বিতর্কেরও হয়তো ইতি টেনে দিলেন আর্জেন্টাইন জাদুকর।

এখন আর পেলে-ম্যারাডোনার সঙ্গে তাকে একই ব্রাকেটে রাখতে হয়তো আপত্তি করবেন না কেউই। ১৩টি গোল ও আটটি অ্যাসিস্ট নিয়ে শেষ হলো মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার।

এবার সাত গোল করে ও তিনটি করিয়ে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বলও জিতেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সর্বোচ্চ আট গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন ফ্রান্সের ট্রাজিক হিরো এমবাপ্পে। দুই পিএসজি সতীর্থের লড়াইয়ে মেসির চেয়ে বেশি গোল করেও শেষ দৃশ্যে কাঁদতে হলো এমবাপ্পেকে। কারণ, এটা মেসির বিশ্বকাপ।

টাইব্রেকার রোমাঞ্চের আগে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে এগিয়ে থাকা আর্জেন্টিনার অনায়াস জয় সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু এমবাপ্পের ৯৭ সেকেন্ডের জোড়া গোলে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে উলটো আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করে ফেলে ফ্রান্স। অতিরিক্ত সময়ে মেসির দ্বিতীয় গোলে ফের পিছিয়ে পড়া ফ্রান্সকে আবারও নাটকীয়ভাবে সমতায় ফিরিয়েছিলেন এমবাপ্পে। কিন্তু তার হ্যাটট্রিক শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেনি।

মাঠে নেমেই কাল জার্মানির লোথার ম্যাথিউসকে (২৫) ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২৬ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছিলেন মেসি। ম্যাচের প্রথম আক্রমণও আর্জেন্টিনার অধিনায়কের।

তবে অফসাইডে থাকায় মেসির দারুণ পাসটি কাজে লাগাতে পারেননি হুলিয়ান আলভারেজ। পাঁচ মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট লক্ষ্যে থাকলেও প্রস্তুত ছিলেন ফ্রান্স গোলকিপার উগো লরিস।

চোট কাটিয়ে ফেরা দি মারিয়া বাঁ দিক দিয়ে একের পর এক ঝটিকা আক্রমণে চাপে রাখেন ফ্রান্সকে। ১৭ মিনিটে উড়িয়ে মেরে ভালো একটি সুযোগ নষ্ট করেন এই আর্জেন্টাইন উইঙ্গার।

তিন মিনিট পর কর্নার থেকে হেড লক্ষ্যে রাখতে ব্যর্থ হন ফরাসি ফরোয়ার্ড অলিভিয়ের জিরু। ২৩ মিনিটে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। বক্সের মধ্যে দি মারিয়াকে ফাউল করে ফ্রান্সের বিপদ ডেকে আনেন উসমান দেম্বেলে।

মেসি পেনালটি নিতে যাওয়ার সময় ধারাভাষ্যকার বললেন, ‘মেসি অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড।’ বোঝাতে চাইলেন, সারা বিশ্ব তাকিয়ে তার দিকে। স্নায়ুচাপ সামলে পেনালটি থেকে ঠান্ডা মাথায় এবারের বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ গোল তুলে নেন মেসি।

তার শটের উলটো দিকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন লরিস। পাঁচ আসর মিলিয়ে বিশ্বকাপে ১২ গোল করে পেলের পাশে বসে গেলেন মেসি। সঙ্গে আটটি অ্যাসিস্ট মিলিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে ২০ গোলে সম্পৃক্ত থাকা প্রথম ফুটবলার মেসি।

এর আগে সর্বোচ্চ ১৯ গোলে সম্পৃক্ত থাকার রেকর্ড ছিল দুই জার্মান জার্ড মুলার, মিরোস্লাভ ক্লোসা ও ব্রাজিলের রোনালদোর। আরেকটি কীর্তিতেও অনন্য আর্জেন্টাইন জাদুকর। বিশ্বকাপের এক আসরে গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করা প্রথম ফুটবলার মেসি।

৩৬ মিনিটে দারুণ একটি প্রতি আক্রমণ থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দি মারিয়া। মাঝমাঠে ফরাসি ডিফেন্ডার উপামেকানো বল হারালে জাদুকরি ফ্লিকে আলভারেজকে খুঁজে নেন মেসি।

আলভারেজের কাছ থেকে বল পেয়ে গতির ঝড়ে ফ্রান্সের অরক্ষিত বক্সে ঢুকে পড়েন ম্যাক অ্যালিস্টার। সুযোগ থাকলেও নিজে শট না নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে ফাঁকায় থাকা দি মারিয়াকে পাস বাড়ান তিনি।

নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ফ্রান্সের জাল কাঁপিয়ে লুসাইলের গ্যালারিতে আরেকবার নীল-সাদা ঢেউ তোলেন দি মারিয়া। গত বছর তার গোলেই ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছিল আর্জেন্টিনা।

বিশ্বকাপেও ফাইনালের মঞ্চে জ্বলে উঠলেন আর্জেন্টিনার নীরব নায়ক। দুই গোল হজমের পর ৪১ মিনিটে দুই ফরোয়ার্ড দেম্বেলে ও জিরুকে তুলে কোলো মুয়ানি ও মার্কাস থুরামকে নামান ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম। প্রথমার্ধে লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি ফ্রান্স।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আর্জেন্টিনার আক্রমণের ঝড়ে ব্যাকফুটে ছিল ফ্রান্স। ৪৯ মিনিটে দি পল, ৫৯ মিনিটে আলভারেজ, ৬০ মিনিটে মেসি ও ৬৩ মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টার কাজে লাগাতে পারেননি টানা চারটি ভালো সুযোগ।

৬৪ মিনিটে দি মারিয়াকে তুলে আকুনাকে নামান আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। প্রথমার্ধে নিজের ছায়া হয়ে থাকা ফ্রান্সের প্রাণভোমরা এমবাপ্পে ৭০ মিনিটে গতির ঝলক দেখালেও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি শট।

৮০ মিনিটে সেই এমবাপ্পের পেনালটি গোলেই নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ফ্রান্স। বক্সের মধ্যে কোলো মুয়ানিকে ফাউল করে ফ্রান্সকে পেনালটি উপহার দিয়েছিলেন ওতামেন্দি।

পেনালটি থেকে লক্ষ্যভেদের পরের মিনিটেই মেসির হারানো বলে মার্কাস থুরামের ফিরতি পাস থেকে বুলেট গতির ভলিতে ফের আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে লুসাইল স্তব্ধ করে দেন এমবাপ্পে।

মেসিকে ছাড়িয়ে সাত গোল নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান ফ্রান্সের স্বপ্নসারথি। ম্যাচে সমতা ফেরানোর পর শরীরী ভাষাই বদলে যায় ফরাসিদের। একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টিনাকে কোণঠাসা করে ফেলে তারা।

যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে দারুণ একটি সেভে মুয়ানিকে গোলবঞ্চিত করেন আর্জেন্টিনার শেষ প্রহরী এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। তিন মিনিট পর জয়সূচক গোল প্রায় পেয়েই গিয়েছিল আর্জেন্টিনা।

অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় মেসির গোলার মতো শট ঠেকিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান লরিস। ১০৫ মিনিটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেওয়ার দুটি সুযোগ নষ্ট করেন বদলি ফরোয়ার্ড লাওতারো মার্তিনেজ।

দুবারই শেষ মুহূর্তে ব্লক করে ফ্রান্সের ত্রাতা উপামেকানো। অবশেষে ১০৮ মিনিটে মেসির দ্বিতীয় গোলে ফের এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। লাওতারো মার্তিনেজের শট ফেরালেও ফিরতি শটে মেসিকে গোলবঞ্চিত করতে পারেননি লরিস।

নাটক তখনো শেষ হয়নি। ১১৮ মিনিটে মন্তিয়েলের হ্যান্ডবলের সুবাদে পাওয়া পেনালটি থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ফ্রান্সকে সমতায় ফেরান এমবাপ্পে। এর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিকের একমাত্র কীর্তি ছিল ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের (১৯৬৬)।

পেনালটি রুখতে না পারলেও শেষ দিকে দারুণ দুটি সেভ করে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে যান এমিলিয়েন মার্তিনেজ। সেখানেও ব্যবধান গড়ে দেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা