" /> বগুড়ায় নিজ লিভারের অংশ দিয়ে দেবরকে সুস্থ করার প্রয়াস
শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৭:০১ পূর্বাহ্ন

বগুড়ায় নিজ লিভারের অংশ দিয়ে দেবরকে সুস্থ করার প্রয়াস

বগুড়ায় নিজ লিভারের অংশ দিয়ে দেবরকে সুস্থ করার প্রয়াস

8 / 100

বগুড়া প্রতিনিধি: ‘‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারেনা’’- বিখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকায় গানের কথাগুলো বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবে জীবন বাঁচাতে শুধু আর্থিক সহযোগীতা নয়, নিজ শরীরের অংশ দিয়ে জীবন সংকটান্ন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে সুস্থ করে তোলা প্রাণপন চেষ্টার মানুষ পাওয়া অনেকটাই দুষ্কর। এমন সহানুভূতি শুধু পিতা-মাতারাই করে থাকে।

নিজ লিভারের অংশ দিয়ে অন্যরকম সহানুভূতির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে মা সমতূল্য ভাবীর সন্ধান মিলেছে বগুড়ায়। তিনি তার অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী দেবর মিজানুর রহমানকে (২৫) বাঁচাতে নিজের লিভারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভাবি নাসনীন হীরা তিথি (২৬)।


জানা যায়, বগুড়ার গাবতলি উপজেলার দিঘাপড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের তিন ছেলের মধ্যে সবার ছোট মিজানুরের লিভারের প্রায় ৮০ ভাগ অকেজো। এক্ষেত্রে জরুরি লিভার প্রতিস্থাপনে নিজের লিভারের কিছু অংশ দেবরকে দেবেন ভাবি তিথি।


এক্ষেত্রে ভাবি নাসনীন হীরা তিথি জানান, বিবাহিত জীবনে আমার দুই মেয়ে সন্তান রয়েছে। কিন্তু আমার কোনো ভাই নেই। তাই মিজানকে আমি আমার ভাই মনে করি। আর চোখের সামনে আমার ভাই(দেবর) মৃত্যুর কোলে ঢেলে পড়বে, তা চাইনা। তাইতো আমি নিজ ইচ্ছায় দেবরকে বাঁচাতে লিভার দিবো। পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়েই আমি সুখ-শান্তিতে বাঁচতেই সব জেনে বুঝেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।


বগুড়া শহরে মিজানুর ও তার ভাই মোক্তার হোসেনের একটি মোবাইল শো-রুম আছে। এক কন্যা সন্তানের জনক মিজানুর পরিবারের সকলকে নিয়ে বেশ ভালই ছিলেন।

গত জুলাই মাসে মিজানুর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। দেশের একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও ভাল ফলাফল পাননি। পরে মিজানুর চিকিৎসকের পরামর্শে ভারতের চেন্নাইয়ে যান। চেন্নাইয়ের রিলা হাসপাতাল থেকে জানানো হয় তার লিভারের প্রায় ৮০ ভাগ অকেজো।


চিকিৎসকদের মতে, মিজানুরকে বাঁচাতে হলে অতি দ্রুত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন (প্রতিস্থাপন) করতে হবে। ডিসেম্বরের মধ্যেই লিভার প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বলেন, অর্ধ-কোটি টাকা ব্যয় হবে শুধু অপারেশনেই। আর লিভার সংগ্রহ করতে হবে নিজেদেরই।


এমতাবস্থায়, মিজানুর পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্ত হওয়ায় বাড়ির সদস্যরা দু-চোখে শরষে ফুল দেখছেন। তাদের সবচেয়ে আদরের ছোট ছেলেকে বাঁচাতে দিন-রাত নানা দিকে ছুটতে থাকেন বাবা-মা, ভাই-ভাবি ও স্ত্রীসহ সবাই।


এমন সময় আশা জাগান মিজানুরের ভাবি (মোক্তার হোসেনের স্ত্রী) নাসনীন হীরা তিথি। দেবরকে বাঁচাতে নিজের লিভার (কিছু অংশ) দিবেন বলে জানালে এতে শঙ্কা কাটে লিভারের। তবুও অনিশ্চয়তায় রয়েছে মিজানুরের জীবন।
কারণ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন জন্য জায়গা-জমি, গহনা সব বিক্রি করেও ৫০ লাখ টাকার অর্ধেকও জোগাড় করতে পারেননি। এর আগে মিজানুরের চিকিৎসায় সবমিলে খরচ হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। নিজ পরিবার ও স্বজনদের সহায়তায় নিয়ে এ খরচ বহন করা হয়। কিন্তু এখন তার পরিবারের পক্ষে চিকিৎসা খরচ বহন করা আর সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে মিজানুর শহরের একটি ক্লিনিকে ভর্তি রয়েছেন।


মিজানুরের ভাই মোক্তার হোসেন জানান, আমরা দুই ভাই লিভার দিতে চাই। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। পরিবারের এমন তীব্র সংকটের সময় এগিয়ে আসেন আমার স্ত্রী। তিথি নিজ ইচ্ছায় মিজানুরকে লিভার দিতে চেয়েছেন। লিভারের ব্যবস্থা হলেও চিকিৎসায় লাগবে আরও ৫০ লাখ টাকা। খুব দ্রুত এই টাকা সংগ্রহ করতে না পারলে আমার ভাইকে বাঁচানো যাবে না বলেও তিনি জানান।


এ দিকে অসুস্থ মিজানুরের বাবা নুরুল ইসলাম জানান, নিজেদের সবকিছু আর মানুষের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত জোগাড় হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। কিন্তু মিজানের চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য প্রয়োজন ৫০ লাখ টাকা।
বগুড়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সামির হোসেন মিশু জানান, সুস্থ ও জীবিত দাতার লিভারের একটা অংশ নিয়ে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। দুই-তিন মাসের মধ্যেই দাতা ও গ্রহীতার লিভারের অংশগুলো বেড়ে স্বাভাবিক আকৃতি পেয়ে যায়। সব ঠিক থাকলে লিভার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে মিজানুর ও তার ভাবি দুজনই ফিরতে পারেন স্বাভাবিক জীবনে।


মিজানুর রহমানকে বাঁচাতে অসহায় মা দিনরাত হাসপাতালে আর্তনাদ করছেন। সহানুভূতি ও সহযোগীতায় এগিয়ে এসেছেন সহপাঠী-সহকর্মী থেকে স্থানীয়রা। বাবা, ভাই-ভাবি, স্ত্রীসহ সবার প্রচেষ্টায় মিজানুর রহমান আবারও সুস্থ হয়ে ফিরবেন এটাই চাওয়া সবার। তার সকলের ভালোবাসায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মিজানুর নতুন করে বাঁচার আশায় স্বপ্ন দেখছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা